কত যান পোড়ানো হলো অবরোধের দুই দিনে


Md Firoj প্রকাশের সময় : নভেম্বর ৬, ২০২৩, ৪:৪৮ অপরাহ্ন /
কত যান পোড়ানো হলো অবরোধের দুই দিনে

বিএনপি-জামায়াত ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর ডাকা ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ কর্মসূচি শেষ হবে মঙ্গলবার ভোর (৭ নভেম্বর) ৬টায়। এরই মধ্যে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় অন্তত ২১টি বাসে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয় বলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে।

সোমবার ৪ গাড়িতে আগুন

সোমবার (৬ নভেম্বর) ছিল অবরোধের দ্বিতীয় দিন। এদিন ভোরে চট্টগ্রামে পৃথক স্থানে দুটি যানবাহনে আগুন দেওয়া হয়। নগরীর পাঁচলাইশ থানার আতুরার ডিপো এলাকায় একটি এবং অপরটি জেলার আনোয়ারা উপজেলার চাতুরী চৌমুহনী স্টেশনে।

আনোয়ারা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ফায়ার ফাইটার মোহাম্মদ সাজিম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, সোমবার ভোরে উপজেলার চাতুরী চৌমুহনী এলাকায় মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বাসে কে বা কারা আগুন দেয়। খবর পেয়ে ভোর ৫টা ৫ মিনিটে আগুন নির্বাপণে কাজ শুরু করি। দুটি ইউনিট ৪০ মিনিট চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি।

গুলিস্তানে বাসে আগুন

অপরদিকে, ভোর ৫টায় নগরীর পাঁচলাইশ থানার আতুরার ডিপো এলাকায় চট্টগ্রাম-হাটহাজারী সড়কে পার্কিংয়ে থাকা একটি সিএনজি অটোরিকশায় অগ্নিসংযোগ করা হয়। পাঁচলাইশ থানার ওসি সন্তোষ কুমার চাকমা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ভোরে আতুরার ডিপো এলাকায় কে বা কারা একটি সিএনজি অটোরিকশায় অগ্নিসংযোগ করে। জড়িতদের চিহ্নিতের চেষ্টা করছি। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এদিকে সোমবার দুপুর ২টার দিকে রাজধানীর গুলিস্তানে বঙ্গবন্ধু স্কয়ার হল মার্কেটের সামনে বিকল্প অটো পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেওয়া হয়। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মিডিয়া শাখার কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম জানান, আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীরা দ্রুত নেমে পড়েন। কোনও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।

গুলিস্তানে পুড়ে যাওয়া বাস

এর আগে সোমবার বিকাল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বর সনি সিনেমা হল মোড়ে একটি বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহসিন জানান, মিরপুর ১০ নম্বর হয়ে আসা আলিফ পরিবহনের একটি বাস মিরপুর ১ নম্বর সনি সিনেমা হল মোড় পার হওয়ার সময় আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় যাত্রীরা প্রাণ বাঁচাতে দ্রুত বাস থেকে নেমে পড়েন। তবে কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

রবিবার ৯ গাড়িতে আগুন

অবরোধ কর্মসূচির প্রথম দিন রবিবার (৫ নভেম্বর) সকাল সোয়া ৭টার দিকে রাজধানীর খিলগাঁও মেরাদিয়া বাঁশপট্টি এলাকায় অসিম পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় মো. সবুজ (৩০) নামে এক যাত্রী দগ্ধ হন। তিনি শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন। বার্ন ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক তরিকুল ইসলাম জানান, সবুজের অবস্থা আশঙ্কাজনক। শ্বাসনালি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াসহ তার শরীরের ২৮ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে।

রবিবার বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বহনকারী চৈতালী নামে একটি বাসে দেয় দুর্বৃত্তরা। রাজধানীর মিরপুরে বাঙলা কলেজের সামনে ওই বাসে আগুন দেওয়া হয়। চৈতালীর কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি আরিফুজ্জামান বর্ষণ বলেন, দুপুর দেড়টার ট্রিপের শিক্ষার্থীদের নামিয়ে ডিপোতে যাওয়ার সময় চৈতালী বাসের দ্বিতীয় তলায় আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। পরে বাঙলা কলেজের শিক্ষার্থীদের সহায়তায় আগুন নিয়ন্ত্রণ আনা হয়েছে। এ সময় শিক্ষার্থীরা বাসে না থাকায় কোনও দুর্ঘটনা ঘটেনি।

চট্টগ্রামে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেওয়াা বাস

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের দারুস সালাম জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মাসুক মিয়া জানান, চৈতালী বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনায় কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।

রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজধানীর বাংলামোটর মোড়ে এয়ারপোর্ট এভিনিউ নামে একটি বাসে আগুন দেওয়া হয়। এসময় গাড়িতে কোনও যাত্রী বা চালক-হেলপারদের কাউকে দেখা যায়নি। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের কর্মকর্তা তালহা বিন জসীম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ করে।

রবিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে মিরপুর সাড়ে এগারোতে শিকড় নামে একটি বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। ফায়ার সার্ভিসের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষের ডিউটি অফিসার এরশাদ হোসেন জানান, সন্ধ্যা ৭টার দিকে মিরপুর সাড়ে এগারোতে শিকড় বাসে অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা সেখানে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনও হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

নীলক্ষেতে প্রাইভেটকারে আগুন

রবিবার রাত সোয়া ১০টার দিকে রাজধানীর নীলক্ষেত মোড়ে একটি প্রাইভেটকারে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। পরে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের কন্ট্রোল রুমের ডিউটি অফিসার রাশেদ বিন খালেদ এসব তথ্য জানান।

প্রায় একই সময়ে, রবিবার রাত ১০টার দিকে কাওরান বাজার রেল ক্রসিংয়ের সামনে একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করে দুর্বৃত্তরা। পিকআপ ভ্যানের পেছনে থাকা একটি সোফা সেটে আগুন দেয় তারা। চালক সোফাটি ফেলে দিয়ে পিকআপ নিয়ে চলে যান। পরে স্থানীয়রা আগুন নিভিয়ে ফেলেন।

রাজধানীর বাইরের ঘটনাগুলোর মধ্যে রবিবার রাত সোয়া ৭টার দিকে খুলনার রূপসা উপজেলার তালিমপুর মসজিদের সামনে রাস্তার পাশে পার্কিং করা যাত্রীবাহী বাসে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। খুলনা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের রূপসা অফিসের সাব অফিসার বেল্লাল হোসেন বলেন, আগুনের খবর পেয়ে দুটি ইউনিট নিয়ে সেখানে যাই। এরপর বাসটির আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। বাসটিতে কোনও যাত্রী ছিল না বলে হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। বাসটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রবিবার রাত সাড়ে ১০টায় চট্টগ্রামে একটি বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার অক্সিজেন মোড়ে রেললাইন সংলগ্ন সড়কে ওই বাসে আগুন দেওয়া হয়। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। অবরোধ কর্মসূচি সমর্থনকারীরা বাসে এ অগ্নিসংযোগ করেছে বলে ধারণা পুলিশের।

খুলনায় বাসে অগ্নিসংযোগ

এর আগে রবিবার ভোরে নগরীর পতেঙ্গা এলাকায় একটি বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। আগুনে বাসটি পুড়ে যায়। এর সঙ্গে জড়িত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

ভোলার চরফ্যাশনে শনিবার মধ্যরাতে যমুনা এক্সপ্রেস পরিবহন নামে একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেওয়া হয়। এ ঘটনায় বিএনপির চার নেতাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রবিবার দুপুরে গাড়িটির চালক হাসান ফরাজি চরফ্যাশন থানায় অজ্ঞাতদের আসামি করে একটি মামলা করেন।

ফায়ার সার্ভিসের তথ্য

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বলছে, রবি ও সোমবারের অবরোধে ২১টি পরিবহনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকাতেই ১২টি পরিবহনে আগুন দেওয়া হয়। বাকি ৯টি অগ্নিসংযোগের ঘটনা দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটেছে।

ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম জানান, রবিবার (৫ নভেম্বর) ভোর ৪টা থেকে সোমবার (৬ নভেম্বর) সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত উচ্ছৃঙ্খল জনতা ২১টি পরিবহনে আগুন দিয়েছে বলে তথ্য পেয়েছে ফায়ার সার্ভিস। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় ১২টি ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া গাজীপুর, কালিয়াকৈর ও  নারায়ণগঞ্জে চারটি;  খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও পটিয়ায় চারটি; বগুড়ায় একটি ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ১৫টি বাস, দুটি ট্রাক, একটি প্রাইভেটকার, একটি সিএনজি চালিত অটোরিকশা ও একটি লেগুনা পুড়ে যায়। এসব আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ৪১টি ইউনিট ও ২৪২ জন জনবল কাজ করেছে।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দিনের বেলা থেকে রাতে আগুনের ঘটনা বেশি ঘটানো হয়েছে। ২১টি আগুনের ঘটনায় সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত ১৬টি ঘটনা ঘটে। বাকি পাঁচটি দিনের অন্যান্য সময় লাগানো হয়েছে।

গত ২৮ অক্টোবর থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত ১১০টি অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ২৮ অক্টোবর ২৯টি, ২৯ অক্টোবর ১৯টি, ৩০ অক্টোবর ১টি, ৩১ অক্টোবর ১১টি, ১ নভেম্বর ১৪টি, ২ নভেম্বর ৭টি, ৪ নভেম্বর ৬টি, ৫ নভেম্বর ১৩টি, ৬ নভেম্বর ১০টি অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।