হরতাল-অবরোধে নারায়ণগঞ্জে অগ্নিসংযোগসহ ১০ গাড়ি ভাঙচুর, গ্রেফতার ২৯৪


Md Firoj প্রকাশের সময় : নভেম্বর ৭, ২০২৩, ৮:০৩ পূর্বাহ্ন /
হরতাল-অবরোধে নারায়ণগঞ্জে অগ্নিসংযোগসহ ১০ গাড়ি ভাঙচুর, গ্রেফতার ২৯৪

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি

হরতাল ও দুই দফা ডাকা অবরোধকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জে অগ্নিসংযোগ, গাড়ি ভাঙচুরসহ পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে বিএনপি নেতাকর্মীদের। এতে দুটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগসহ কমপক্ষে ১০টি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। এসব ঘটনায় জেলার সবকটি থানায় দফায় দফায় ১৫টি মামলায় ২৯৪ জন নেতাকর্মীকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। 

জানা গেছে, বিএনপির ডাকা অবরোধের সময়ে নাশকতার অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় একটি, ফতুল্লা মডেল থানায় তিনটি, সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় দুটি, বন্দর থানায় দুটি, আড়াইহাজার থানায় দুটি, সোনারগাঁও থানায় দুটি ও রূপগঞ্জ থানায় তিনটিসহ মোট ১৫টি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় ৭১৪ জন বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৯৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

এসব মামলায় বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদ, নির্বাহী কমিটির সদস্য ও নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন, নির্বাহী কমিটির সদস্য কাজী মনিরুজ্জামান মনির, মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু, অধ্যাপক মামুন মাহমুদ, নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান, সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু, জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মাশুকুল ইসলাম রাজিবসহ অসংখ্য নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) চাইলাউ মারমা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, হরতাল ও অবরোধকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন থানায় মোট ১৫টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ২৯৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

প্রসঙ্গত, দীর্ঘদিন পর গত ২৯ অক্টোবর সারা দেশে হরতালের ডাক দেয় বিএনপি দলটি। তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জামায়াতে ইসলামীও হরতালে সমর্থন দিয়েছে। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে নারায়ণগঞ্জে বিএনপির নেতাকর্মীরা সড়কে নেমেছেন। হরতালের দিন রবিবার (২৯ অক্টোবর) সকালে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া বালুর মাঠ এলাকায় মিছিল নিয়ে জড়ো হন মহানগর ও যুবদল বিএনপির নেতাকর্মীরা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়াসহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

বিএনপির নেতাকর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছুড়ে। পরিস্থিতি শান্ত করতে পুলিশ তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছে। এতে একজন পুলিশসহ অন্তত ৯ জন আহত হয়েছেন। ওই দিন সকালে শহরের মিশনপাড়া এলাকায় বিএনপির একটি মিছিল থেকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচল করা উৎসব ট্রান্সপোর্টের একটি বাসে ভাঙচুর চালানো হয়। পরে বাসটিতে আগুন দেওয়া হয়। একই এলাকায় বন্ধু পরিবহনের আরেকটি বাসে ভাঙচুর চালানো হয়। তবে উভয় ঘটনায় কোনও হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া আড়াইহাজার উপজেলায় বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে কমপক্ষে ১৫ জন আহত হয়েছেন।

এক দিন বিরতি দিয়ে ৩১ অক্টোবর থেকে টানা তিন দিন অবরোধের ডাক দেয় বিএনপি। অবরোধের প্রথম দিন (মঙ্গলবার) সকালে আড়াইহাজার উপজেলায় মহাসড়ক অবরোধ করতে গেলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এ সময় বিএনপির সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের ত্রিমুখী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে  কুপিয়ে ও ইটের আঘাতে তিন পুলিশ সদস্যকে আহত করা হয়। এ ছাড়া বিএনপি ও আওয়ামী লীগের কমপক্ষে ২০ নেতাকর্মী আহত হন। অবরোধের দ্বিতীয় দিনে বুধবার (১ নভেম্বর) সকালে নারায়ণগঞ্জের তিন মহাসড়কে (ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট ও এশিয়ান হাইওয়ে) অগ্নিসংযোগসহ তিনটি গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

একইভাবে অবরোধের তৃতীয় দিন বৃহস্পতিবার (২ নভেম্বর) সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে আগুন জ্বালিয়ে ও ককটেল বিস্ফোরণ করেছে বিএনপির নেতাকর্মীরা। এ ছাড়া সড়কে তিনটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। এ সময় সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সাবেক যুগ্ম-আহ্বায়ক টিএইচ তোফাসহ তিন জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এ ছাড়া আড়াইহাজারে পুলিশে ওপরে হামলার ঘটনায় বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেল থেকে বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুকুল ইসলাম রাজীবসহ ১০ জন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-১১।

এরপর মাঝে দুই দিন বিরতি দিয়ে ফের দ্বিতীয় দফায় অবরোধের ডাক দেয়। অবরোধ শুরুর আগের দিন শনিবার (৪ নভেম্বর) রাতে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় অনাবিল পরিবহনের একটি বাসে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এতে বাসের সবগুলো সিটসহ বিভিন্ন অংশ আগুনে পুড়ে যায়। রবিবার (৫ নভেম্বর) অবরোধের প্রথম দিনে জেলার বিভিন্ন স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে ও অগ্নিসংযোগ করে সড়ক অবরোধ করেন বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এমনকি ঝটিকা মিছিল বের করেন। এ ছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ককটেল বিস্ফোরণসহ অন্তত তিনটি গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। আর এশিয়ান হাইওয়ে এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়কেও টায়ার জ্বালিয়ে ও অগ্নিসংযোগ করে অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন দলের নেতাকর্মীরা।

দ্বিতীয় দফার অবরোধের শেষ দিনে নারায়ণগঞ্জে পৃথক তিনটি স্থানে বিক্ষোভ করেছেন দলটির। সোমবার (৬ নভেম্বর) সকালে সিদ্ধিরগঞ্জে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সামনে ও গোদনাইল এলাকায় এবং বন্দর উপজেলার মদনপুরে সড়কে টায়ার, কাঠের চৌকিতে পেট্রোল ঢেলে অগ্নিসংযোগ করেন তারা। এদিকে রূপগঞ্জে অভিযান চালিয়ে অবরোধের সময়ে অগ্নিসংযোগ, গাড়ি ভাঙচুরসহ সহিংস কাজে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত ককটেল, বোমা ও অগ্নেয়াস্ত্রসহ ছাত্রদলের চার নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। এ সময় তাদের কাছ থেকে ১২টি ককটেল, ১০টি পেট্রোলবোমা, একটি বিদেশি পিস্তল ও ম্যাগজিন উদ্ধার করা হয়।

আটকরা হলেন- জেলা ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি সুলতান মাহমুদ, রূপগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সদস্য সচিব মাসুদুর রহমান, সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফ বিল্লাহ ও দাউদপুর ইউনিয়ন ছাত্রদল নেতা তৌহিদ হাসান। 

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেল বলেন, রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজার থানায় বিএনপি-জামায়াতের হরতাল ও অবরোধে গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পরিকল্পনায় ও ঘটনায় জড়িত থাকার কথা তারা স্বীকার করেছে। তাদের মোবাইল ফোনে সংরক্ষিত মেসেজ, কথোপকথন, ছবি ও ভিডিও পর্যালোচনা করে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে।